Wednesday, March 30, 2016

নানুরে বসন্ত এসে গেছে...

স্থানঃ নানুর, বীরভূম
কালঃ বসন্ত
সময় কালঃ বর্তমান

চন্ডীদাস ডাক দিলেন  "রামীণী,  এই অবেলায়, হাওয়াবদলের সময় নদীর ঘাটে বসে কাপড় কাচলে যে ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার ।  দিনের আলো নিবে এল যে....

" চলো প্রিয়তমা রামীণী, আর যে সয়না বিরহ আমার, মধুর হোক আজ যামিনী ।" 

সুন্দরী রামীণি  আলুলায়িত চুলের লক্‌স ভিজে হাতে পুঁছে বললে,

যাই গো যাই !  কাপড় কেচে যেটুকুনি পাই, কোনোরকমে পেট চলে, তা কি তোমার জানা নাই ?

চন্ডীদাস বললেন, সে তো ভালো করেই জানি....

আমার মত অধম স্বামী, একটিও কাব্যমালা বেচতে পারিনা আমি ।

রামীণির ভিজে আঁচল । কাপড় কেচে কেচে পায়ে হাজা । কাপড়কাচার পাটার ওপর থেকে কাপড়কাচার ব্রাশ ,উজালার কৌটো, রিভাইভ, আলা ইনস্টোব্লিচ, ভ্যানিশ লিক্যুইড আর শীতপোষাকের জন্য ফেব্রিক ফেন্ডলি ইজি জেন্টল ওয়াশ।   ডাঁইকরা সদ্য কাচা ভিজে কাপড় দেখিয়ে চন্ডীদাসকে বললে, একটু নিঙড়ে দাও বাপু, হাতের কবজিতে আর জোর পাইনে।  চলো গিয়ে মেলে দি, ঐ জামাকাপড়,  ধোবিঘাটের ঐ লাইনে ।

চন্ডীদাস আড়চোখে দ্যাখেন রামীর ঢলঢল কাঁচা যৌবন । নিজেকে মনে হয় বড় পুণ্যবাণ ।  আগের বৌ ত্যাগ দিয়েছে অভাবের জ্বালায় । বাশুলীদেবীর থানে রামীকে নিজের পত্নী বলে মেনেছেন ।   এখন রামী তাঁর ধ্যান, রামী তাঁর বাগদেবী । প্রতিটি রাতের  অপেক্ষা । নতুন নতুন কামকলা।   আর রামীর অণুপ্রেরণায় চন্ডীদাসের রোজ নতুন নতুন কবিতা লেখা..... 


এদিকে কবিতার পান্ডুলিপি  সংবাদপত্রের দফতরে জমা পড়ে গেছে অনেকদিন   । কিন্তু দফতর থেকে কোনো উচ্চবাচ্য নেই । আর চন্ডীদাসের কাছে না আছে সেই পান্ডুলিপির প্রতিলিপি না আছে কোনো যোগাযোগের মাধ্যম । স্বয়ং উপস্থিত হয়ে  জেনে আসতে মানে লাগে তাঁর । দফতরের ইমেল জানেনা, ফোন নম্বর জানেনা সে ।   অথচ সংবাদপত্র ত পাঠিয়েও দেননি সেই কাব্য সম্ভার । অতঃপর নিজেই গেলেন লাজলজ্জা সম্বরণ করে । তাঁরা জানালেন কাব্যের বিনিময়ে তো বহুদিন পূর্বেই  তাঁকে ভূমি, জীবিকা এবং নানাবিধ উপহারে ভূষিত করেইছেন তিনি । কিন্তু চন্ডীদাস বললেন কিন্তু আমার পুঁথিটির কি হবে? তার স্বত্ত্ব কার থাকবে ? আর কেই বা সে পুঁথির প্রচার করবে ? মানুষ জানবেনা সেই অমূল্য পদ রচনার সুললিত কাব্যমালা ?

সংবাদপত্রের আধিকারিক বললেন "আপনার কাব্য সত্যি খুব সুন্দর, মন আর প্রাণ এককরে রচিত। অপূর্ব ছন্দমাধুরী পদের । কিন্তু কৃষ্ণ যে আপনার হাতে কলঙ্কিত, লম্পট এক ব্যক্তিত্ত্ব । মূল ইতিহাসকে যা বিকৃত করে, ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে ।" 


চন্ডীদাস আহত হয়ে বললেন তাঁর পদসম্ভার ফিরিয়ে দিতে ।


সংবাদপত্রের আধিকারিক বললেন "এত বড় আস্পর্ধা? ঐ পুঁথির কথা ভুলে গিয়ে নতুন পদ রচনা করুন।আমাদের কাছে গচ্ছিত থাক ওটি। আর যদি ভরসা না থাকে নিয়ে যান আপনার ঐ সব বস্তাপচা পদ সম্ভার! আরো রগরগে করে পদ লিখুন মশাই! পাবলিক খাবে তবে!" 
অসহায় চন্ডীদাস ফিরে এলেন রিক্ত হাতে । 

 ...................................................... সেই সমাচার অব্যাহত । সেই ট্র্যাডিশান চলে আসছে যুগ যুগ ধরে । 


Saturday, February 13, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (৭)

তিনি আজো একটি ব্র্যান্ড--সরস্বতী  

তিনি নদীই হোন বা দেবী  তিনি আমাদের কাছে পূজনীয়া সর্বশুভ্রা সরস্বতী । নদী বা দেবী কিম্বা  দুটোই ভেবে নিয়ে আমরা সরস্বতীর পায়ে বছরের পর বছর চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি  ।  কিন্তু যদি ভেবে নিই তিনি আমাদের মধ্যে কোনো একজন মেয়ে তাহলে সমাজের স্তরে স্তরে এমন মেয়ের গল্প কিন্তু আমাদের খুব চেনাজানা ।

এমন  গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি  পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের  শক্তিমান পুরুষদের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । অব্যাহত থাকে তার লড়াই। চলুন সেই  কিম্বদন্তীর কড়চা খুলি আধুনিক ভাবে।


 কোনও এক সময়…

একদিন  ব্রহ্মার তলব তাঁর মেয়ে সরস্বতীকে । সে মেয়ে তখন নদী। উঠে এল পাতাল থেকে। বাপের চাহনি সুবিধের নয়, তা মেয়ে জানত। বাপ বলল,

-এবার তোমাকে আমার কাছে সর্বক্ষণ থাকতে হবে, এ আমার আদেশ ।

মেয়ে বলল, কারণটা কি শুনি? বাপ বলল, আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা গায়ত্রী জপ করব।

মেয়ে বলল, মামদোবাজি পেয়েছ? বুড়ো ভাম একটা। ঐ পুজোর ছুতোয় আবার আমার গায়ে হাত দেবে? আমি পুরুষদের থেকে সর্বদা দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করি।

– সব পুরুষ আর আমি বুঝি এক হলুম?

মেয়ে বলল, আমি কি আর জানিনা? তোমার চারটে মাথা, আটটা চোখ, সর্বদা ঘুরছে আমার পেছন পেছন।

–  মনে রেখো তুমি আমার মেয়ে।

সরস্বতী গর্জে উঠে বলল, তো কি, তাহলে জেনে রাখো তোমার জন্যেই বিশেষতঃ আমি পাতালে থাকি।

মেয়েটা তখন ছুটল মহাদেবের কাছে।

-ঐ দ্যাখো, শিবুকাকা! বুড়োটা কি বলে! বলে কিনা আমাকে ভোগ করবে।

-হ্যাঁ, বলিস কি রে? ব্যাটা বুড়ো , বাপ্‌ হয়ে তোর দিকে নজর দেয়? শিবুকাকা মানে মহাদেব বললেন।

-জানো? ঐ যে তোমাদের স্বর্গের দালাল? কি যেন নাম? হ্যাঁ, মদনবাবুকেও বলছিল চুপি চুপি, আমি শুনেছি সে কথা….” মদন কিছু করো, এই সুন্দরী কন্যার প্রতি সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা যে ”

-বলিস কিরে? এত বড় স্পর্ধা! এই সেদিন করে সভায় বড়মুখ করে ব্রহ্মা বলল, ” ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন, আজ থেকে আমারও মানস কন্যা এই মেয়েটির নাম দিলাম সরস্বতী ”  আর আজ সে তোকে কামনা করছে?  এড়িয়ে চল, পালিয়ে যা মা!

সরস্বতী বলল,

-কোথায় যাব? তাঁর দুষ্ট দৃষ্টি যে সর্বদা আমাকে চোখেচোখে রেখেছে। নিস্তার নেই আমার।

মহাদেব বললেন,

-তবে রে? দাঁড়া, ঐ কামদেব মদনকে আগে ভস্মীভূত করি! ব্যাটার দালালি করা বের করছি আগে।  ব্রহ্মা ভেবেছেটা কি তার পেশীর জোর আমার থেকেও বেশী? এবার দ্যাখ, কে বেশী শক্তিমান। কার কত বাহুবল?

সরস্বতী বলল, বাঁচালে শিবুকাকা! তুমি‌ই আমার সত্যিকারের পিতাশ্রী।

আবার দিন-কয়েক পর….
 ব্রহ্মা গেলেন ক্ষেপে। সরস্বতীকে তেড়ে গিয়ে তার প্রতি খুব দুর্ব্যবহার করে বললেন, তবে রে? আমি তোর কে ভুলে যাসনিরে মেয়ে।

মহাদেব তখন শরবিদ্ধ করে ব্রহ্মাকে হত্যা করলেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন।

আবারো কোনও একদিন…

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন সেই  বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে…. ।

– সুন্দরী, কি অপরূপ লাবণ্যময়ী তুমি! তোমার নরম চাহনি, তরঙ্গায়িত, সুললিত শরীর, একটু জল দেবে?  প্রচুর জল চাই, প্রাণ ভরে দিতে পারবে তোমার জল?

সে মেয়ে ভাঙে তবু মচকায় না। পারলে চ্যালাকাঠ নিয়ে তাড়া করে ইন্দ্রকে। তার ছলাকলা বুঝতে বাকী নেই। স্বর্গে তার খুব নাম খারাপ। মেয়েছেলে দেখলেই সে ছোঁকছোঁক করে! মনে মনে ভাবল সরস্বতী।

– আমি কি বুঝিনা তোমার দুরভিসন্ধি? আসল কথা বলো!

ইন্দ্র বলল,

– পালাবে আমার সাথে?  সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিল ।

সরস্বতী  ইন্দ্রের মতলব বুঝতে পেরে  তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান ।

সে বলল,

– বাপু তুমিও সুবিধের নও।  ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে আমার  গতিপথ ঘোরাব । কিন্তু তোমার সাথে যাবনা।

অবশেষে ব্রহ্মার অনুরোধে সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেল সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । নিজে ক্রেডিট নেবেন তিনি। নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। আরও পাঁচজন সাথে থাকলে ব্র্যান্ড ডাইলুশ্যান!  যাই বল সরস্বতী ব্র্যান্ড নিঃসন্দেহে জবরদস্ত ।

পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেল সরস্বতী আর তক্ষুনি মহাদেব বললেন

– কি রে মেয়ে? এত ঘুরিসনা। অত ধকল কি মেয়েছেলের সহ্য হয়? আবার পথে বিপদ হতে পারে। যা সব বদমায়েশ লোকজন পথেঘাটে!

নে এবার আগুণ নিভিয়ে দে তোর জল দিয়ে। আমি তোর সুবিধের জন্য সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে  নিয়ে এসেছি ।

সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল । ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র ।

অন্য কোনদিন…

আবারো স্বর্গে দুই দাপুটে ঋষি, বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠর কত অত্যাচার সহ্য করল এই মেয়ে। দুই ঋষির কি ছোঁকছোঁকানি এই সরস্বতীকে নিয়ে!  দুজনেই চায় এই মেয়েকে ভোগ করতে।

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । কাছেই বিশ্বামিত্রের আশ্রম। বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রে আদায়-কাঁচকলায়। দুজনারই ক্রাশ। দুজনারই টার্গেট সরস্বতী।

বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন

– বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচণ্ড বেগে  লণ্ডভণ্ড করে প্রবাহিত হও নয়ত খুব খারাপ হবে  , বলে দিলাম ।

সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । সে মনে মনে ভাবল,  নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে বুড়োর।

– আমি তো কারো ক্ষতি করিনা সাধু!তুমি কি চাও বল তো।

– আমি চাই ব্যাটা পাজি বশিষ্ঠ যেন আমার ত্রিসীমানায় না থাকে।

অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশ্বামিত্র তো বেজায় খুশি । মনে মনে ভাবল, এদ্দিনে বশিষ্ঠ জলে ডুবে মারা যাবে আর সে তখন সরস্বতীকে পেয়ে যাবেই।   কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনও হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেন ও বিশ্বামিত্রের এহেন দুরভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন । সেই দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম “শোন-পুণ্যা” ।

এবার দেখি সরস্বতী নামে আমাদের মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা বাড়ান নি ? না কি আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন ?  না কি একাধিক সপত্নীর সাথে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ?

নাহ, তিনি পালিয়ে যান নি। পরাজিত হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী ।

কালের কপোলতলে…

বিষ্ণু ভাবছিলেন গঙ্গা, লক্ষ্মীর পর সরস্বতীর সাথে যদি ঘর বাঁধা যায়। অমন সুন্দরী, বিদুষীকে ঘরণী করলে মন্দ হবেনা। সরস্বতী তা বুঝতে পেরেই সমূলে বিষ্ণুর সেই প্ল্যানে কুঠারাঘাত করলেন। পুরুষের প্রতি তদ্দিনে তার ঘৃণা জন্মেছে। বিয়ের ফাঁদে আর নয়।

দুই স্ত্রী গঙ্গা আর লক্ষ্মীর মধ্যে বিষ্ণু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন । নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুঃখ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।

গঙ্গার মুখোমুখি হলেন ।

– শোনো গঙ্গা এটা কিন্তু ঠিক হচ্চেনা। তোমার স্বামী কিন্তু লক্ষ্মীরো স্বামী। সেটা মনে আছে তো?  লক্ষ্মী কেমন মনে মনে কষ্ট পায়, ডুকরে কাঁদে, তুমি দেখতে পাওনা?

লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন ।

সরস্বতী বললেন, যা বাবা, যার জন্যে চুরি করি, সেই বলে চোর?

সে নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছে বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিল ।

ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন। বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।

সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ?   রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা “থাকাথাকি’তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা ।   সরস্বতী সাজগোজ , পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি “হেড টার্নার’ ; হতেই পারে । সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণে বলা হয় সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে ।

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে নির্ভয়া, দামিনী বা আমানত হয়ে যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া ! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে ।   সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় !!!

Sunday, December 13, 2015

স্বর্গীয় রমণীয় (৫)



গঙ্গা ছিল সেক্সবম্ব । সগ্গের সব দেবতারা হেডটারনার এই মেয়ের প্রেমে এক্কেরে ফিদা। সক্কলেই সে সময় ছুটেছিল গঙ্গাকে পাবার আশায়, একটু যদি তাকে ছুঁতে পারে অথবা একটু ফস্টিনষ্টি করতে পারে। মানে বেশী কিছু নয় দেবতারা নিজেদের দেবীদের ফাঁকি দিয়ে এক্সট্রা ভার্জিন মেয়ের সাথে পরকীয়া...এই আর কি। কিন্তু গঙ্গা নাছোড় কন্যে। সেক্সি হলেই কি সস্তা নাকি? অতএব মুখ বেঁকিয়ে সে চলে যেত কম্বুকন্ঠীর মত গ্রীবা হেলিয়ে। সগ্গে বসে বসে এট্টু মেয়েবাজি না করে সারাদিন যুদ্ধ আর অসুর ঠ্যাঙাতে কি ভাল্লাগে? তাই সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ছোঁকছোঁকানি। ঐ মানে একটু ডাইভারশান। আর কিছুতো নেই সে মুলুকে। ইনটারনেট, কেবল, সেলফোন, ল্যাপটপ, এফ এম রেডিও। বরফের রাজ্যে সারাদিন যেন সফেদ সমাধিতে বসে থাকা আর গোঁফে তা দেওয়া, দাড়ি চুলকোনো আর জটার উকুনবাছা । এদিকে তেমনি এক সগ্গরাজ্যে বড় হচ্ছিল গঙ্গা। যেমন তার রূপ তেমনি তার চলন। যেমন তার লাবণ্য তেমনি সে গম্ভীর। ভাঙে তবু মচকায়না।
তুখোড় সব দেবতারা নাকানিচোবানি। তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গিয়ে আর পেলেম না টাইপ অবস্থা সকলের। এদিকে অযোধ্যার রাজা সগর তখন ভাবছেন অশ্বমেধ যজ্ঞটজ্ঞ করে সগ্গের দেবরাজ হবেন।
প্রথামত একটি অশ্বকে মন্ত্রপূত করে ইচ্ছাভ্রমণে ছেড়ে দিলেন । সে বচ্ছরান্তে ঘুরে ফিরলে অনুষ্ঠান, যাগযজ্ঞ ইত্যাদি হবে। সগর তাঁর ষাটহাজার পুত্রকে নিয়োগ করলেন অশ্বটির রক্ষকরূপে।
এদিকে দেবরাজ ইন্দ্রের মহাচিন্তা হল। তিনি ভাবলেন যদি এই অশ্বমেধ যজ্ঞের সফলতার কারণে সগরের মনস্কামনা পূর্ণ হয় তবে উনি স্বর্গ্যরাজ্য হারাতেও পারেন । তাই রাতারাতি অশ্বটিকে সবার অলখ্যে পাতালে সরিয়ে দিয়ে ঘোড়াচোরের আখ্যা পেলেন । পাতাল প্রদেশে সমুদ্রতটে আশ্রমে ধ্যানমগ্ন কপিলমুণির কাছাকাছি অশ্বটিকে বেঁধে রাখলেন ইন্দ্র।
সেযুগে স্বর্গ বলা হত উত্তরের উচ্চতর হিমালয়কে। মর্ত্য হল সমগ্র সমতট ভূমি আর্যাবর্ত আর পাতাল হল সমগ্র দক্ষিণের নিম্নভূমি । জল-জঙ্গলে পরিপূর্ণ, শ্বাপদসঙ্কুল, খাল-ডোবা-নালা আর সাপখোপের আখড়া এই দুর্গম পাতালরাজ্যটি ছিল সাধারণের অগম্য স্থান। স্বর্গ, মর্ত্যের সর্বত্র অশ্বটিকে খুঁজে না পেয়ে সগররাজার ষাটহাজার পুত্র পাতালে অনুসন্ধান কার্য চালাল। এক মুণির কুটিরের সমুখে অশ্বটিকে বাঁধা দেখতে পেয়ে তারা ভাবল এই মুণি‌ই বুঝি অশ্বচোর। তাদের প্রশ্নে, কোলাহলে ধ্যানম্গ্ন কপিলমুণি ক্রোধের বশে সগরের ষাটহাজার পুত্র ভস্মীভূত হল ।
এবার যজ্ঞের ঘোড়া ফিরে না আসায় সগরের খোঁজ শুরু। ভাইয়ের পুত্র অংশুমানকে পাঠালেন সন্ধান করতে। অংশুমান ঘুরতে ঘুরতে কপিলের আশ্রমে দেখলেন যজ্ঞের ঘোড়াটিকে। কপিল জানালেন অংশুমানের ষাটহাজার পিতৃব্যের ভস্মীভূত হবার কথা। তাকে ঘোড়াটি ফিরিয়ে নিয়ে যাবার কথা বললেন। কিন্তু অংশুমান সেই ষাটহাজার পিতৃব্যের পারলৌকিক ক্রিয়া-তর্পণ কোথায় সারবেন? সাধারণ জলে তো তাদের মুক্তি অসম্ভব। অংশুমান ফিরে এলেন সগর রাজার কাছে। অশ্ব ফিরে আসায় সগররাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন কিন্তু পুত্রগণের আত্মার কল্যাণে কোনো কাজ হলনা দেখে মনের খুঁতখুঁতুনি থেকেই গেল। স্বর্গ থেকে গঙ্গাধারাকে নামিয়ে না আনলে কি করে তাঁর পুত্রদের আত্মার মুক্তি সম্ভব? ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর ততদিনে কেউ গঙ্গা নামের ঐ সুন্দরী মেয়ের নাগাল পাওয়া তো দূরের কথা, চোখের দেখা দেখেও ফ্যান্টাসাইজ করতেও পারেনি।
কলকাঠি নাড়লেন নাটের গুরু নারায়ণ। গঙ্গা মাঈয়্যা কিছুতেই মর্ত্যে অবতরণ করবেনা ? স্বর্গসুখ ছেড়ে নীচে নামতে সে নারাজ?
ব্রহ্মার হাতে কমন্ডলু থাকত । শিবের থাকত জটা। বিষ্ণু ভাবলেন এই হবে আমার ইউএসপি। মায়ার খেলায় তিনি ওস্তাদ।
সগর রাজবংশের আরেক উত্তরসুরী কোশলরাজ ভগীরথ নারায়ণের আদেশে একহাজার বছর কঠোর তপস্যার পর ব্রহ্মাকে তুষ্ট করতে সমর্থ হন । নারায়ণ কাজে লাগালেন তাকে।
নারায়ণ গেলেন ব্রহ্মার সামনে । যেই না ব্রহ্মা হাতের কমন্ডলুর জল নারায়ণের পাদপদ্মে ঢালা অমনি নারায়ণের পা ধোয়া জল গড়িয়ে পড়ল সহস্রধারা রূপে। নারায়ণ বললেন, ভগীরথ এই হল তোমার গঙ্গাধারা। হাতের শাঁখটি ভগীরথের হাতে দিয়ে বললেন, এই হল প্রকৃষ্ট সময়। গঙ্গাকে এবার ভুলিয়ে ভালিয়ে মর্ত্যে নিয়ে চলো। তুমি শাঁখ বাজাতে বাজাতে আগে চলো আর পেছনে চলুক এই জলধারা।
উদ্ভিনযৌবনা গঙ্গার সিডাকশন মেকানিজমটা একটু ভিন্নস্বাদের। সামনে তার মধ্যবয়সী, সংসারে চেটে যাওয়া মাঝবয়সী হ্যান্ডসাম । সেও বলে আমিও খেলাব তাদের। স্বর্গের সুখ যখন ছেড়েইছি তখন তোমাদেরো কালঘাম ছোটাবো।
ভগীরথ চললেন । পেছনে রূপসী গঙ্গা । কিন্তু নাছোড় গঙ্গা একবার লুকোয় গুহার মধ্যে তো আরেকবার ঢুকে পড়ে গিরিকন্দরে । আবার খলখল করে বয়ে চলে তো আবার নানা অছিলায় হারিয়ে যায় ভগীরথের চোখের সামনে থেকে। পাহাড়ীপথ ভগীরথের শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়। কিন্তু সু‌উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ থেকে কি করে সে লাফিয়ে পড়বে ? বেগবতী স্রোতস্বিনীর আছড়ে পড়া কি আর ধরিত্রী স‌ইতে পারবে? রসাতল হবে সেই চিন্তায় ব্রহ্মা ভগীরথকে শিবের শরণ নিতে বললেন। শিব মাথা পেতে দাঁড়িয়ে নিজের জটায় ধারণ করলেন গঙ্গাকে। পাহাড়ের মাথা থেকে লাফিয়ে পড়লেন গঙ্গা। শিবের জটাজাল ছিন্নভিন্ন করে স্বর্গ প্রবাহিনী গঙ্গার ধারা মর্ত্যে প্রবাহিত হল ।
এইভাবে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি সামলিয়ে অবশেষে ভগীরথের দেখানো পথ ধরে গঙ্গা হল দক্ষিণমুখী। সবশেষে ভগীরথের শঙ্খধ্বনি অণুসরণ করতে করতে গঙ্গা গিয়ে সোজা হাজির কপিলমুনির আশ্রমের দিকে। আর বঙ্গের মধ্যে গঙ্গার এই দক্ষিণমুখী শেষ ধারাটির নাম হল ভাগিরথী । সাগরদ্বীপে গঙ্গার জলের স্পর্শে সগরমুণির ষাটহাজার পুত্রের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হলে শান্তি পেল তাদের পারলৌকিক আত্মা। উদ্ধার হয়ে স্বর্গে পাড়ি দিল তারা।
মেয়ের কাজ শেষ। লীলায়িত ছন্দে গঙ্গা ঝাঁপ দিলেন সমুদ্রে। গঙ্গার সাথে সাগরের মিলন হল আর এই স্থান বিখ্যাত হল সাগরসঙ্গম বা গঙ্গাসাগর নামে।
কিন্তু ফাইনালি ভগীরথ-ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরকে ডিচ মেরে গঙ্গা তার দয়িতের সাথে মিলিত হল। সেটাই এ গল্পের ট্র্যাজেডি।

স্বর্গীয় রমণীয় (৩)


মেয়ে যুদ্ধ করে জিতে এয়েচে, মানে দশহাতে অসুর বধ করেচে, দেশ জুড়ে সবাই মেয়েটাকে বাহবা দিতেছে.... মাদুগ্গা কৈলাসে ফিরে গেচেন অনেকদিন হল। দেবতারা বসে সেখানে গোঁফে তা দিতেছেন।
একা মেয়েছেলের কত ক্ষেমতা বাপু, কেষ্টদা অকপটে মেনে নিল।
কেউ বলছে, ধুস্‌ তবুও যদি বুঝতুম একা সামলেছে সব।
ধার করা সব অস্ত্র শস্ত্র পেলে আমারাও অমন দশটা অসুর মারতে পারতি, ইন্দর দাদাবাবুতো কোনো রাখঢাক নেই, বলেই ফেল্ল।
তবে যাই বলো বাপু দুগ্গাটা দেকিয়ে দিল! শিবুদা বৌয়ের প্রশংসায় আরো কয়েক ছিলিম বেশী গাঁজা নিয়েছে ।
এখন কৈলাসে মহিষাসুর বধের দ্বিতীয় ইনিংসের তোড়জোড়। বড়াখানার আয়োজন হচ্ছে। দুর্গার অনারে। তবে অহংকারে পা পড়তেচেনা কারো। যেন তেনারাই যুদ্ধ করে এয়েচেন। তাই দেখে শুনে শিবুদা বললেন তা তোমাদের বৌয়েরা তো সব পাটরাণী। বলি আমার বৌ অসুর মেরেচে তো তোমাদের এত গর্বের কি! এমন ভাবখানা কচ্চো যেন তোমরাই মেরেচো!
ব্রহ্মা সেই শুনে একটা ফন্দী আঁটলেন। ব্রাহ্মণের রূপ ধরে রাজসভায় এসে সকলের সামনে একটা তৃণ মানে কচি দুব্বোঘাসের টুকরো রেখে বললেন, দেখি কত্ত ক্ষেমতা বাপু তোমাদের্? এই তৃনটাকে উড়িয়ে দাওতো যেমন করেই হোক!
পবনদেব এলেন। বললেন্, এ আর এমন কি! কিন্তু শত চেষ্টা করেও পারলেন না ঐ ঘাসের টুকরোকে হটাতে। এরপর অগ্নিদেব এলেন তৃণকে পুড়িয়ে দেবার জন্যে। সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও বিফল হলেন।
তখন ব্রহ্মা স্বয়ং নিজের রূপ ধরে বল্লেন, কি করে পারবে তোমরা? সারাটা জগতকে যিনি ধারণ করে রয়েছেন তিনিই তো মায়া-মমতা-স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছেন ঐ তৃণটুকুনিকে। অতএব স্বীকার করলে তো ঐ জগদ্ধ্বাত্রীর কত্ত ক্ষেমতা? আর তোমরা কিনা দুর্গার অসুরবধ নিয়ে বুক ফোলাচ্ছ্, গোঁফে তা দিছ, পার্টির আয়োজন কচ্চো যেন তোমরাই অসুরটাকে মেরেচো!!!
অতএব এখন দুর্গা=কালী--জগদ্ধ্বাত্রীর অনারে আরো একবার পার্টি হৌক্! কেষ্টদা বলে উঠলেন!!!

Saturday, December 12, 2015

স্বর্গীয় রমণীয়(২)


স্বর্গীয় রমণীয় – কবিতা ক্লাব (রম্যরচনা-নভেম্বর-২০১৫)

-বলি হচ্ছেটা কি? আমার বৌ ফর্সা হবে না কালো হবে তা নিয়ে কার এত মাথাব্যথা! আমি যদি স্বেচ্ছায় কালোমেয়েকে ঘরে তুলি তাতে কার কি বলার আছে বাপু! কালো আর ধলো বাইরে কেবল, ভেতরে তো সব এক‌ই বাপু! বলি আমার সাথে ছিষ্টি করতে পারলেই তো কেল্লাফতে ! তা নয় সেই কালোমেয়েটা ঘরে আসা অবধি কানের কানকো নাড়িয়ে দিল ! নন্দী, এক ছিলিম কড়া করে গাঁজা সেজে আনতো !
শিবুদা বেশ ঝেঁঝে রয়েছেন। দুধেআলতা পায়ে নতুন বৌটা ঘরে ঢোকেনি তখনো তাই নিয়ে কৈলাসে কানাঘুষো চলছে । কেষ্টদা তো মুখ ফসকে বলেই ফেললেন, "হোক কলরবের" তালিম নিয়েছেন তালেবররা
ইন্দর দাদাবাবু ঠিক এই সময়েই শিবুদার মনোরঞ্জনের জন্য অপ্সরাকে তাঁর কাছে পাঠালেন! 'দিন আগে শিবুদার বলে, না জানি কি অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করেছেন তাই ভেটস্বরূপ শিবুদাকে ঘুষ হিসেবে স্বর্গের বার-ড্যান্সার পাঠানো । যে যার কানেকশান দেখায়। শিবুদা কালীকে বিয়ে করে এনে ভাবে কতবড়ো নারীর ঘরণী তিনি। ইন্দরদাদাবাবু অপ্সরাদের পাঠিয়ে দেখাতে চান কত ক্ষেমতা তার। মাঝখান থেকে কালীর নাভিশ্বাস ওঠে ।
শিবুদার আবার ইন্দর দাদাবাবু, কেষ্টদার মত মেয়েমানুষে ছোঁকছোকানি নেই । তিনি বেশ ভয়ে ভয়ে অপ্সরাদের বললেন, দেখো, আমার ঘরে নতুন বৌ এখন। তোমরা বরং তার অতিথি হও ! এই বলে কালীকে অপ্সরাদের সামনেই আদরের সাথে ডাকলেন,
-হে অঞ্জনসদৃশ শ্যামলী, আমার রূপসী কুচকুচে কালী, ওগো বধূ ব্ল্যাক-বিউটি ! ক‌ই ? এসো একটিবার সামনে, দ্যাখো কারা এসেচেন তোমার সাথে আলাপ করতে, তোমাকে নাচগান শোনাতে!
ফর্সা অপ্সরাদের সামনে এরূপ কুরুচিকর সম্বোধনে কালী গেলেন ক্ষেপে। একে নতুন বৌ, তায় আবার রাসভারী, মেজাজী, দাপুটে এক নারী। তাঁর মোটেও সহ্য হলনা।
তিনি মনে মনে বললেন, " কি এত বড় আস্পর্ধা! আমাকে বাইরের নারীর সামনে কালো বলা! আমিও দেখিয়ে দেব আমার প্রকৃত স্বরূপ। মনের দুঃখে গঙ্গায় গিয়ে তপস্যা শুরু করলেন কালী। নিজের গায়ের কৃষ্ণকোষগুলি একে একে পরিত্যাগ করলেন। যেন খোলস ছাড়ছেন তিনি। দ্বিখণ্ডিত ব্যাক্তিত্ত্ব বা স্প্লিট পার্সোনালিটি বলে যাকে। কালো রং অনায়াসে বদলে ফেলে কালী হলেন গৌরী ।
এবার ঝাঁটারূপেণ সংস্থিতা হয়ে গৌরী অপ্সরাদের সম্মুখে এসে হাসিমুখে বললেন,
-এবার বুঝতে পারছো তোমরা? নেশাভাঙ করে, ছাইভস্ম মেখে তোমাদের শিবুদার মাথাটা এক্কেবারে খারাপ হয়ে গেছে। আমায় বলে কিনা নতুন বৌ! আমার সংসারে কত্ত কাজ আর আমি নাকি এখন নাচ-গান শুনব? তা মেয়েরা, তোমরা আজকাল বুঝি একটু বেশী খাচ্ছো। নাচের ফিগারটাতো নষ্ট করে ফেলেচো দেকচি। আমার বাবার আমল থেকে তো তোমাদের জানি । হেলেন, মিস শেফালি মার্কা ধুবলা পাতলা ছিলে সব! বলি এহেন বপু নিয়ে বালা নাচো কি করে ? তার চেয়ে আগে একটু মেদ ঝরাও, তারপর না হয় এসো কৈলাসে। আমি ফরাস বিছিয়ে, আতর ছড়িয়ে, অম্বুরী তামাক সেজে বসে থাকব তোমাদের জন্যে।
এদিকে অপ্সরাদের সামনে তো তিনি গৌরী ওদিকে আড়ালে অন্তঃপুরে আবার তিনি অভিমানে জর্জরিতা কালী । শিবুদার সেদিন কালরাত্রি। কালীর সাথে সেরাতে ভেট হবার কথা নয়। কিন্তু পান্ডববর্জিত স্বামীর ঘরে শাশুড়ি-ননদের কাঁটাও নেই। অগত্যা সেরাতেই ফর্দা ফাঁস।কিন্তু অন্তঃপুরে বৌকে খুঁজে পেলেননা শিবুদা। বিস্মিত শিবুদা নারদকে সব খুলে বললেন। নারদ একাধারে স্বর্গের গেজেট অন্যধারে রয়টার। খবর সংগ্রহ করতে তার জুড়ি নেই। অচিরেই খবর নিয়ে জানালেন শিবুদার বৌ কালী সুমেরু পর্বতের মাথায় এক দুর্গম স্থানে অভিমানে গোঁসাঘরে । নারদ তো পাঁচা করতে ওস্তাদ । তিনি সাপের গালেও চুমু খান, ব্যঙের গালেও চুমু খান। কালীর কাছে হাজির হয়ে তাঁর গোঁসার কারণ জানতে চাইলেন। কালী বললেন, শিবুদা তাঁর বিহনে কেমন আছেন? নারদ বললেন্, খাসা আছেন। কালীর জন্য তাঁর বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। তিনি এখন পুনরায় বিয়ে করার জন্য বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।
কালী সেই কথা শুনে রেগে আগুণ, তেলে বেগুণ হয়ে ষোড়শী মেয়ের রূপ ধরে এক ছুট্টে শিবুদার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি ভুলে গেলে তোমার প্রতিজ্ঞা? আমায় বিয়ে করে আবারো তুমি বিয়ে করতে চলেছো? সেই কথা শুনে শিবুদা তো মহা খুশি। ভাবলেন নারদকে পাঠিয়ে কাজ হল । কালীকে জড়িয়ে ধরে হামি খেতে খেতে বললেন, আমি যে কে তোমার, তুমি তা বুঝে নাও। আমি চিরদিন তোমারি তো থাকব, তুমি আমার, আমি তোমার....ব্লা, ব্লা, ব্লা । আজ থেকে তোমার এই মহাবিদ্যারূপের নাম দিলাম ভুবনেশ্বরী।

Monday, November 16, 2015

স্বর্গীয় রমণীয়(৪)


কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।

কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !
সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!
কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।

কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!

রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।

স্বর্গীয় রমণীয়-(১) কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য...


তারকাসুরের অত্যাচারে সমগ্র দেবকুল অতিষ্ঠ। কেউ বধ করতে পারছিলনা তাকে। দরকার হল অমিত পরাক্রমশালী এক যোদ্ধার যে কিনা অনায়াসে বধ করবে তাকে এবং দেবতাদের রক্ষা করবে।
তারকাসুর নিধনের জন্য ব্রহ্মার একবার মনে হল শিব-পার্বতীর একটা ছেলে হওয়া খুব দরকার। সে হবে দেবসেনাপতি।  ব্রহ্মার আদেশ মাথায় নিয়ে শিবুদা পার্বতীকে নিয়ে মহাসুখে দরজায় খিল আঁটলেন। রতিবিহ্বলা পাব্বতী কাঁচুলি খুলছেন এলো চুলে। একে একে সব বস্ত্রের পরত সরাতে সরাতেই  শিবুদা ফিদা এক্কেরে।  জটাজুট মাথায় তুলে এবার জোরকদমে প্রস্তুতি.. চলতে লাগল সম্ভোগ পর্ব। ওদিকে হর-গৌরীর অন্তহীন ফোর-প্লে তে  রতিক্রিয়া বিলম্বিত হল। অধৈর্য হয়ে শিবুদার ইয়ারদোস্ত দেবগণ বলল, বুড়ো ভাম বেম্মাদার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, ঘাটের মড়া শিবুটাকে এই বয়সে কিনা ঐসব কম্মো করতে পাঠায়!  তারা  মদনদেবকে প্রথমে পাঠালেন শিব-পার্বতীর মাষ্টার বেডরুমে তলব করতে। শিবুদা চরম উত্তেজনার মুহূর্তে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে মদনকে বাণ মেরে ভস্মীভূত করলেন। আবারো দরজায় খিল। এবার পাঠানো হল অগ্নিকে। শিবের অবস্থা তখন নালে-ঝোলে। পার্বতীকে ইমপ্রেগনেট করা তো দূরের কথা মৈথুনরত শিবের রেতঃ স্খলিত হল অগ্নির সম্মুখে। শিবুদার কাপড়েচোপড়ে অবস্থা দেখে,  অগ্নি মূল্যবান কেমিক্যালটুকুকে কোনোমতে  নিয়ে গঙ্গায় ফেলে এলেন। ব্যাস! একফোঁটাই অনেক।  সেখান থেকে দেবশিশুর জন্ম হল। তাই গঙ্গা হল কার্তিকের জন্মদাত্রী জননী। এবার কে দেখবে এই সদ্যোজাতকে?গঙ্গার তো অবৈধ শিশু কার্তিক। উপায়ও হল সাথে সাথে.... ছ'জন কৃত্তিকা, মানে আয়ার সমতুল্য ঐ শিশুকে স্তন্যদান করে পালন করতে লাগলেন। পার্বতী জানতে পেরে রেগে অগ্নিশর্মা।ছেলে বলে কথা!!! যেহেতু ঐ পুত্র শিবের ঔরসজাত ঐ পুত্রের মা হবেন তিনিই । তাই তো মাদুর্গা না বিইয়ে কানাইয়ের,  থুড়ি "কার্তিকের মা" হয়ে গেলেন। আর তারকাসুর বধ করে ফেমাস হয়ে গেলেন দেবসেনাপতি বা দেবলোকের আর্মির মেজর জেনারেল । টেকনিক্যালি গঙ্গার গর্ভে জন্ম তাই কার্তিকের এক নাম গাঙ্গেয়। থিওরিটিকালি কৃত্তিকারা মায়ের মত পালন করেছিল তাই আরেক নাম কার্তিকেয় ।
আর বেসিকালি মহাদেবের পুত্র তাই আরেক নাম শিবসুত ।