Thursday, November 17, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় - ১৩ "রাস, c/o ভাগবত"



"তোমরা আমাকে ভালোবাসা দাও, আমি তোমাদের ভালোবাসা দিব" কানুদা এমনটি বলতেন। আমজনতাকে অবিশ্যি নয়। গোপিনীদের। গোপবালারা এক সে বড় কর এক সুন্দরী, অদ্বিতীয়া প্রেমিকা আর সারাক্ষণ কৃষ্ণপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া বৃন্দাবনের কিছু রমণী। এই বৃন্দাবনের গোপবালারা ভক্তিযোগে কানুকে পাবার জন্য আমরণ চেষ্টা করে গেছেন। রাধার সাথে কানুর পিরীতি তাদের বুকে শেল হয়ে বাজত। রাধা একাই কেন পাবে কানুকে? তাদের যুগলে দেখতে পেলে ঝলসে যেত গোপিনীদের চোখ, ফেটে যেত বুক। এহেন কূটনৈতিক কানু যাদবের চিন্তা হল। এত কষ্টের তৈরী ব্র্যান্ড। যুগে যুগে সেই ব্র্যান্ডকে বাজিয়েই চলেছে আম আদমী। কিন্তু বৃন্দাবনের গোপিনীরা কানুর পিরীতি থেকে বঞ্চিত থেকে যদি সেই আদি অনন্ত দুধ সাদা ব্র্যান্ডে কালি ছিটিয়ে দেয়? অগত্যা মধুসূদন। কানু যাদব ফন্দী আঁটলেন। শারদীয়া উত্সবের পরপর আম আদমীর মনখারাপ থাকে।গোপিনীদেরো ঘরের কাজকর্মে একটু ঢিলাঢালা ভাব থাকে। উত্সবের হ্যাঙ ওভার কাটতে না কাটতেই কার্তিকের পূর্ণিমায় আয়োজন করবেন রাস উত্সব... এই ছিল প্ল্যান। তিনিই স্বয়ং ইভেন্ট ম্যানেজার। c/o ভাগবত !

অতএব সতীলক্ষ্মী সব গোপিনীদের সঙ্গে কানুদার একান্তে গেট টুগেদার হল রাসলীলা। আর তাই তো কানুদা হলেন রাসবিহারী। এ হল দ্বাপরের বেত্তান্ত। তারপর কলিতেও সেই ট্র্যাডিশন অব্যাহত। বৃন্দাবনের আনাচেকানাচে কানুগত প্রাণ গোপিনীদের হৃদয়যন্ত্রে সেদিন বেজে উঠেছিল ভালোবাসার সেই সুর যা এখনো হৃদয়ঙ্গম করছেন সারা দেশের মানুষ। অতএব কানুদার রাধার সাথে পরকীয়ায় নিজের দাপুটে ব্র্যান্ডে কেউ কালি ছেটাতে পারেনি।

ঠিক যে মূহুর্তে গোপিনীরা "নাহ্‌, ঐ বাঁশী শুনে আর কাজ নাই" ভাবল তখনি কানুদা রাসলীলার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলেন। মানে একপ্রকার গোপিনীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই বসলেন বিচক্ষণ কানুদা। আগে বাজাতেন ভৈরবী, ইমন, শুদ্ধ বিলাবল, ভূপালী এইসব রাগ-রাগিনী। এখন বাজালেন আহির ভৈরব, পুরিয়া ধ্যানেশ্রী, আশাবরী ...যত করুণ রসে সিঞ্চিত সুরের ঝর্ণা তত‌ই পাগলপ্রায় গোপিনীদের অবস্থা। অভিসারের কথা না জানিয়েই ছুটে যেতে ইচ্ছে হল প্রাণ। সবকিছু দিতে ইচ্ছে হল কানু-দয়িতের জন্যে।

কেউ তখন দুধ দুইছিল, কেউ দুধ জ্বাল দিচ্ছিল, কেউ রাঁধছিল খিচুড়ি। কেউ নিজের সন্তানকে দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত ছিল। কেউ স্বামীকে দফতরে পাঠানোর জন্য দেখভাল করছিল। যে যেমন অবস্থায় ছিল ঠিক তেমন অবস্থায় সবকিছু ফেলে রেখে ছুটল সেই বাঁশীর পিছুপিছু।

"কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মন-প্রাণ"

একজন গোপিনী স্নানের পর চন্দন দিয়ে অঙ্গরাগ করতে ব্যস্ত ছিল। একজন পরছিল কাজল। একজন সবেমাত্র কাঁচুলি পরেছে, ভুলে গেল উত্তরীয় পরিধানের কথা। একজন আবার এক কানে কুন্ডল পরেই দৌড়ল। "উথালিপাথালি ওদের বুক, মনেতে নাই সুখ রে, আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে"

লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে কানুর কুঞ্জবন রূপ বৈঠকখানায় ছুটল তারা।

চুলোয় যাক্‌ সংসার! রসাতলে যাক স্বামী-পুত্র! "রইতে নারে, বাঁশীতে ডেকেছে যারে"

বাঁশীওয়ালার ডাকে সাড়া দিয়েও বিপদ হল গোপিনীদের। কানু বাঁশীওয়ালা পরীক্ষা নেন সতত‌ই। গোপিনীরা পূর্ণিমার রজতশুভ্র জ্যোত্স্নায় বৃন্দাবনের কুঞ্জে এসেছে সব ছেড়েছুড়ে। এর মধ্যে কে কানুকে সত্যি ভালোবাসে আর কে লোক দেখানো সেটা যাচাই করতে তিনি বললেন, ভয়ঙ্কর রাতে, বনে বাদাড়ে হিংস্র বন্যপ্রাণী আছে। অতএব তোমরা ঘরে ফিরে যাও। গোপিনীরা বলল, চাঁদের আলোয় আঁধার তো দিন হয়েছে আর বৃন্দাবনের জন্তু জানোয়ার বন্ধুপূর্ণ অতএব আমরা আজ ফিরবনা এরাতে। কানুদা আবারো বললেন, তোমাদের পরিবারের লোকেরা কি বলবে? তাদের অহেতুক চিন্তা বাড়িওনা। কিন্তু গোপিনীরা নারাজ। "রহিল মোর ও ঘর দুয়ার".... কেষ্টারে লয়েই থাকবেন তেনারা।

নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করতে লাগল" আজ সব ছেড়ে চলে এলাম তার জন্যে, আর এখন কিনা তিনি বলছেন ফিরে যেতে?" এদিকে প্রেমের অনুঘটক রূপে কাজ করল কার্তিকের মৃদুমন্দ হিমেল বাতাস, আকাশে রূপোর থালার মত পূর্ণচন্দ্র, আর ভেসে এল নানা ফুলের গন্ধ।

দিশেহারা হয়ে গেল সতীলক্ষ্মী গোপিনীরা। তন্ময় হয়ে গেল কানুচিন্তায়। ভুলে গেল দেহ-গেহ। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তারা একদৃষ্টে চেয়ে কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গেল একে একে। কানুর রূপ, বাঁশীর সুর, প্রেমের অনুকূল প্রকৃতি সবকিছু মিলেমিশে একাকার তখন। তাদের পরপুরুষের হাবভাব, চালচলন, চটূল হাসি, অকপট অনুরাগ, মধুর বাক্যালাপ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগে ব্যস্ত তারা।

"ভিতর বাহিরে, অন্তর-অন্তরে আছো তুমি, হৃদয় জুড়ে"

তারা যারপরনাই হারিয়ে ফেলল নিজ নিজ পৃথক সত্ত্বা। প্রগাঢ় প্রেমে বুঝি এমনটিই হয়ে থাকে। পাগলপ্রায় গোপিনীরা উচ্চৈস্বরে গাইতে লাগল গান... "হরিনাম লিখে দিও অঙ্গে"



 কানুর দুষ্টুমি শুরু হল তখন। অশোক, নাগকেশর, চাঁপা গাছের আড়ালে চলে গিয়ে পরখ করতে লাগলেন তাদের প্রেমের আকুতি। লুকোচুরি চলল কিছুক্ষণ। কানুর প্রিয় ছোট ছোট ফুলগাছ, কুর্চি, মালতী, জাতি। এদের কাছে গিয়ে গোপিনীরা জিগেস করল তারা... কানুকে দেখেছ ?

এভাবে চলল কিছুক্ষণ। অবশেষে বৃন্দাবনের তরুলতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে তারা লক্ষ্য করল কানুর খালিপায়ের ছাপ। ওরা ভাবল আবারো বুঝি কানু সেই রাধার সাথে দেখা করতে চলে গেছে। খুব অভিমান হল তাদের। হঠাত তারা দেখল কিছুদূরেই রাধা মূর্ছিত হয়ে পড়ে আছে। তা দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হল গোপিনীদের। সখীদের সেবায় রাধার জ্ঞান ফিরল। তাকে নিয়ে গোপিনীরা চাঁদের আলোয় যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায় ততদূর গেল। তন্ন তন্ন করে খুঁজল কানুকে। তবু তার দেখা নাইরে। তার দেখা নাই। তারপর কানুর স্তুতি শুরু হল।

তারপর কিছুটা মান-অভিমানের পালা। যার জন্য আমাদের সব ছেড়ে চলে আসা, যার বাঁশীর শব্দে আকৃষ্ট হয়ে আমরা এই গভীর বনে চলে এলাম, যার কষ্টে আমরা এতদিন কষ্ট পেলাম, যাকে ভালোবেসে আমরা সকলের কাছে খারাপ হলাম সেই কানু কিনা আমাদের বুঝলনা? অতএব কানু একজন শঠ ব্যক্তি। তিনি মিথ্যাচার করেছেন। তিনি কপট। কানু বেচারা তখনো ইনভিজিলেটরের ভূমিকায়। পরীক্ষা তিনি নিয়েই চলেছেন।

আচমকা অতর্কিতে কানু বেরিয়ে এলেন বনের মধ্যে থেকে। গলায় বনমালা আর পরণে পীতাম্বর পট্টবস্ত্র। আকস্মিক মৃত সঞ্জীবনীর কাজ হল। গোপিনীরা প্রাণ ফিরে পেলেন যেন। এবার শুরু প্রকৃত লীলার ।

সংস্কৃত গোপী শব্দটির অর্থ হল রাখালি বালিকা যাঁরা গো-সেবা করেন। কেউ বলেন গোপিনী, কেউ আবার বলেন গোপীকা। এঁরা হলেন ভক্তিমার্গে বিচরণকারী ব্রজের রমণী। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন কৃষ্ণের একশো আটজন সখী...এঁরা হলেন বৃহত্তর বলয়ের নিবিড় সাথী... চন্দ্রাবলী এঁদের মধ্যে অন্যতম। আরো নিবিড়তর বলয়ের অষ্টসখী হলেন চম্পকলতা, চিত্রা, ইন্দুলেখা ,রঙ্গদেবী, সুদেবী, তুঙ্গবিদ্যা, ললিতা, বিশাখা.......। আর সবচেয়ে কাছের এবং অন্যতমা হলেন শ্রীরাধিকা। শ্রীকৃষ্ণচরিতামৃত অনুযায়ী সব মিলিয়ে বৃন্দাবনে তখন কৃষ্ণের সাথে ষোলোহাজার গোপিনী সঙ্গ করেছিলেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দূত ছিলেন তাদের প্রভুর। কেউ কেউ ছিলেন পরিচারিকা বা সেবাদাসী।

শ্যামলী তার চন্দনচর্চিত বাহুদুটি দিয়ে কানুকে জড়িয়ে ধরল। চন্দ্রাবলী বিনয়ের সাথে হাতজোড় করে প্রেমের পরিচয় দিল। শৈব্যা অঞ্জলিপুটে কানুর চর্বিত পান গ্রহণ করল।পদ্মাবতী নিজের বুকের মধ্যে কানুর চরণযুগল রাখল । ললিতা অনিমেষ নয়নে কানুর শ্রীমুখ দর্শন করতে করতে বিহ্বল হয়ে পড়ল। বিশাখা কানুকে নিজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করে চোখ বুঁজে পরম তৃপ্তি লাভ করল। আর যে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে কানু আমার, আমি কানুর ন‌ই সেই রাধিকা অভিমানে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। বৃন্দার কানুকে দেখে পাগলপ্রায় অবস্থা। বিদ্যুত্লতার মত দেহবল্লরী নিয়ে চম্পকলতা স্থানুবত দাঁড়িয়েই র‌ইল। কখন প্রভু কৃপা করে তার হাতটা ধরবেন একটু! একটু হবে স্পর্শসুখ। বহু প্রতিক্ষীত একটুকু ছোঁয়া লাগা স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাবেন আবার গৃহকাজে।

অতঃপর প্রাণে খুশীর জোয়ার এল। কেঁপে কেঁপে উঠল গোপবালারা। সায় দিয়েছে কানুর মন। বিরহের অবসান হল। দেবতারা বিমানে চড়ে উপস্থৈত হলেন স্বর্গলোকে। পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। দুন্দুভি বেজে উঠল। রাসমন্ডল শতশত ব্রজবালার নূপুরের সিঞ্জিনী, বলয়ের কিঙ্কিনীতে তোলপাড় হতে লাগল। এ যেন এক স্বর্গীয় লীলাখেলা। সকল গোপিনীরাই অনুভব করল যে কানু তাদের দুহাত দিয়ে কন্ঠ আলিঙ্গন করছেন। নিজের মহিমাবলে কানু তখন একই অঙ্গে বহুকৃষ্ণে লীলা করতে লাগলেন তাদের সাথে। প্রত্যেকেই খুশি তখন। সম্মোহন শক্তিতে আপ্লুত তারা। সকলের মনে হল কৃষ্ণ শুধু তার্, আর কারো নয়। নিজের নিজের কাছে প্রিয়তমকে দেখে সকলেই উদ্বেলিত তখন। ব্রজবালারা কটিবন্ধের চাদর কষে বেঁধে নিলেন। কঙ্কন-বলয়ে রোল তুলে, মল-নূপুর, বিছুয়া বাজিয়ে উদ্দাম নৃত্য করতে লাগলেন সেই একমেবাদ্বিতীয় কৃষ্ণকে ঘিরে। গাইতে লাগলেন শ্রুতিমধুর গান। কানু নিজের গলা থেকে মল্লিকাফুলের মালা ছুঁড়ে দিলেন গোপিনীদের দিকে। দীর্ঘায়ত হল সে রাত। নক্ষত্রমন্ডল রাস দেখতে দেখতে বিস্মৃত হল অস্ত যেতে।

এখন আমাদের প্রশ্ন হল শ্রীকৃষ্ণ কেন পরস্ত্রীদের সাথে এহেন পরকীয়ায় লিপ্ত হলেন? আদৌ কি এ পরকীয়া প্রেম না কি অন্যকিছু? না কি দেবতা বলে তাঁর সাতখুন মাপ? ভাগবত অনুযায়ী তিনি মায়ায় বশ করেছিলেন। নিজের সাথেই নিজে খেলা করেছেন। যে ব্যক্তি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁকে একান্ত আপনার করে পেতে চায় তাঁর সাথে তিনি এমন লীলাই করেন। গোপবালারা উপলক্ষ্য মাত্র। শ্রীধর স্বামী তো বলেইছেন

"রাসলীলায় শৃঙ্গাররস ছলনামাত্র। আসলে এই লীলা মুক্তিপ্রদায়িনী।" আর তাই তো তিনি এখনো বৃন্দাবন তথা সমগ্র বিশ্বের একমেবাদ্বিতীয় ব্র্যান্ড এম্বাস্যাডার!!!

Tuesday, November 1, 2016

রমণীয় ভাইফোঁটা

স্বর্গীয় রমণীয় (৪)
ভাইফোঁটা

কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।


কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !

সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!

কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।


কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!


রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।j

Saturday, August 20, 2016

আবার সে এসেছে ফিরিয়া

চাদ্দিকে যা রম্যের ঘটা, তাই কলম ধরতে ভয় যদি না হাসে পাঠক আমার ? তবুও লিখতে হয়। এই ধরুন মাগ্যির ম্যাগি নিয়ে যা কান্ডটি হল! আমি কোথায় ভাবছিলাম মিডডে মিলে ম্যাগি চালু হল বলে! ম্যাগি তো হল গিয়ে বাচ্ছাদের স্টেপল ফুড এখন। ব্যস্ত গৃহিনী, চাকুরে গৃহিণী, রুগ্ন গৃহিণী, রান্নার মাসীর অনুপস্থিতিতে ল্যাজে গোবরের গৃহিণীর পরম আদরের বন্ধু হল গিয়ে ম্যাগি। স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষ্যে, এভারেস্টের মাথা থেকে কন্যাকুমারীকার জলে যেখানে যাবে কাপ্-ও-নুডলসের খাপ কিম্বা ম্যাগির পরিচিত হলদে প্যাকেটটি পেয়ে যাবে। তা না দেখি আমার প্রিয় ম্যাগির নামে কত কেচ্ছা! মোনো সোডিয়াম গ্লুটামেট আছে তাতে, লেড আছে তাতে! আরে থাকুকনা মশাই! কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরোতে পারে! জানেননা? আজ যে রাজা কাল সে ফকির। চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়! আজ যে সিবিআইয়ের ফাঁদে কাল সিবিআই যে তার ফাঁদে পড়বেনা কে বলতে পারে? এফ এম সি জির দলদাস আমরা কি বাপু অতশত বুঝি? আমাদের যেমন চালাও তেমন চলি। আমরা যন্ত্র, মিডিয়া আমাদের যন্ত্রী। মোদের যেমন নাচাও, মোরা তেমনি নাচি । ধরুণ ম্যাগিকান্ডের কোপ এবার গিয়ে সোজা পড়ল পাড়ার ফুচকার ফ্যাক্টরীতে অথবা আইসক্রিমের এঁদোগলিতে। ফুচকার জলে নাকি মশার লার্ভা থেকে শুরু করে পুকুরের জল পর্যন্ত থাকে। পুকুরের জলে শৌচকর্মের বীজাণুরা দিব্যি হেসে খেলে বেড়ায়। সস্তার আইসক্রিম নাকি ড্রেনের জলে তৈরী হয়। তাতে জলজ্যান্ত স্ট্যাফাইলোকক্কাসরা দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে দিনের পরদিন আর হিম-সাগরে অবগাহন করে তাদের নাকি মা-ষষ্ঠীর কৃপায় দিব্যি বংশবিস্তার চলতে থাকে। একটু গরমে এলেই ওরা ক্ষমতা দেখায়। গলায় ব্যথা, কাশির অব্যর্থ জীবাণু রূপে রোগসংসারে ওদের খুব নামডাক । ম্যাগিকান্ডে না হয় একটা মাল্টিন্যাশানাল বাঁশ খেল কিন্তু ফুচকায় হাত দিলে কিম্বা ঐ ফুটপাথী আইসক্রিমে হাত দিলে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। এক ঘা পড়বে ফুচকাওলার ঘাড়ে। এক ঘা পড়বে লোকাল দাদার ঘাড়ে। এক ঘা পড়বে স্থানীয় কাউন্সিলারের ঘাড়ে। আর বাদবাকী পনেরোটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ার আগেই সেখানকার যত ডাক্তারবাবুরা আছেন তাঁরাই ব্যাপারটাকে চাপা দিয়ে দেবেন। কারণ? কারণ রোগী বিনা ব্যাবসা নাই, ডাক্তারবাবুর ঘুম নাই। অতএব ফুটপাথী ফুচকা ও আইসক্রিম চলতেই থাকবে। লোকাল দাদা আর কাউন্সিলর সাহেবকে ঐ ডাক্তারবাবুরাই ম্যানেজ করে দেবেন। লোক দেখিয়ে দিনকয়েক ফুচকাওলা অন্য পাড়ায় গিয়ে দাঁড়াবে। আইসক্রিম ওয়ালা দুকুরবেলায় না বেরিয়ে সন্ধ্যের ঝুলে আইসক্রিম বিকোবে আর ড্রেনের জলে, পুকুরের জলে চুন ছড়িয়ে কাউন্সিলার সাহেব মাইক হাতে বলবেন" ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে দেওয়া হল সর্বত্র অতএব আজ থেকে পত্রপাঠ মশার লার্ভা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অন্তর্হিত হল এই এলাকা থেকে।" কানেকানে মাইক সরিয়ে ফুচকাওলাকেও বলে দেওয়া হল, যেমন চলছে চলুক। "তোমরা আমাকে তোলা দাও, আমি তোমাদের ফুচকা বেচতে দেব"। ডাক্তারবাবু মহাখুশিতে তাঁর ছাদের ওপর গভীররাতের নৈশভোজ ডাকলেন। সে যাত্রায় ফুটপাথী ফুচকা আর আইসক্রিম রক্ষে পেল। হোয়াটসএপ থেকে ফেসবুক সর্বত্র ম্যাগি নিয়ে জোকের ছড়াছড়ি। আরে মশাই ম্যাগি তো সলমন খানের চেয়েও বড় সেলেব। ঐটুকুনি হলদে প্যাকেট আর অত্তখানি স্বাদে ভরা, সুবিধেয় ঠাসা একটা মাল! ছোট্ট ছেলেটা স্কুল থেকে এসে বলল, মা! ম্যাগি ছেলে না মেয়ে বলতো? মা আবার "মাগী"র সাথে ম্যাগির নৈকট্য বুঝে উত্তর দিলেন "মেয়ে" ছেলে বলল, "হলনা, ওতো দু'মিনিটে তৈরী হতে পারে, তাই ম্যাগি হল ছেলে, ইয়ে! মাই ফেভারিট ম্যাগি! আমার ম্যাগি চাই-ই, ব্যস! আমিও ছেলে, ম্যাগিও ছেলে" ছেলের বাবা বলল, "আর সত্যি যদি লেড থাকবে তাহলে সারাদেশের ছেলেরা আজকে সলমনের মত মাসল ফুলিয়ে নটরাজ-বন্ডেড লেড, এইচবি" আর মা সেই শুনে বলল, "তাহলে মেয়েরা অত সীসা হজম করে নিশ্চয়‌ই অপ্সরা, এক্সট্রা ডার্ক, ঠিক যেন ব্ল্যাক বিউটি কৃষ্ণকলি!” মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে ম্যাগি বিতর্কে সামিল হলেন ভোলাদা আর শিবুদা। ভোলাদা বললেন, "যাই বল আর তাই বলো ম্যাগি একদম বন থেকে বেরোল টিয়ে, সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। ভিনিভিডিভিসি করে আজ নুডলস দুনিয়ায় তার মত পপুলার কেউ নেই। আমার মনে হচ্ছে ঐ এম-এন-সি মানে, যারা ম্যাগি তৈরী করে তাদের সাথে ডাক্তারবাবুদের ষড় আছে। নতুন নতুন রোগের সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন তারা। হাঁচি-কাশির যুগ শেষ হয়ে ডিপথিরিয়া-টিবির যুগ ফুরোল। এডস-হেপাটাইটিস নিয়েও মানুষ যথেষ্ট সচেতন এখন। তাই নতুন কিছু ভাবনা নিয়ে হাজির হতে হবে । মিলেনিয়ামের পনেরো বছর নতুন কিছুই এগোয়নি আর। কেবল "তারে জমিন পর", "পা", "মাই নেম ইজ খান" অথবা "ফিফটিন পার্ক এভিনিউ" ছাড়া ! অতএব চলো, কুছ করকে দেখানা হ্যায়। জাপানের মিনামাতা উপসাগরে বিষ পড়ায় মাছেদের মৃত্যু ও তা থেকে মানুষের মৃত্যু হয়ে গেল গেল রব উঠেছিল। সেখানেও সীসা ছিল মধ্যমণি অতএব চলো লেড পয়জনিং নিয়ে মাতামাতি কাম আন্দোলন করি আমরা। প্রথমে আমরা ক্ষেপিয়ে বেড়াই ম্যাগি নিয়ে । তারপর ঝড় থেমে গেলে আবালবৃদ্ধবনিতাকে পুছতাছ করে তার লেড পয়জনিং আদৌ হল কিনা দেখি কিছু টেষ্ট করে। তারপর বাজারে এই রোগ নিয়ে কিছুদিন উত্তেজনা চলবে। মিডিয়া বলবে। মানুষ ভয় পাবে। তারপর চারদিকে পাড়ায় পাড়ায় লেড পয়জনিং এক্সপার্ট ডাক্তারবাবুর ক্লিনিক চালু হবে। যেমন হযেচে "ইনফার্টিলিটি এক্সপার্ট', "ওবেসিটি এক্সপার্ট", "এনোরেক্সিয়া এক্সপার্ট" ..তেমনি আরকি!লেড পয়জনিং বা যার গালভরা নাম "প্লাম্বিজম" অথবা আরো বড়সড় নাম "কলিকা পিক্টোরিয়াম" বাবুদের চেম্বারে দেখলে রোগীরাও সচেতন হবে। হাজারো গন্ডা টেষ্টক্লিনিকে নতুন টেষ্ট হবে। নতুন রোগ মানেই নতুন জনকারী। নতুন জনকারী মানেই শোরগোল। অতএব সে যাত্রায় মনে হচ্ছে ম্যাগি পার পেয়ে যাবে। তাই ম্যাগির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন মাননীয় ডাক্তারবাবুরা। একটু আধটু লেডও থাকুক। আজিনামোটোর ছোঁয়াও থাকুক। বেঁচে যাক এমএনসি। বেঁচে থাক ম্যাগি। বেঁচে যাক ছেলেবুড়ো ! সার্জেনরা কিন্তু মুষড়ে পড়েছে বড়। ম্যাগি না খেলে বেরিয়াট্রিক সার্জারী বন্ধ হয়ে যাবে। দিব্যি ম্যাগির ফ্যাট হজম করে বাচ্চাগুলোর ওবেসিটি হচ্ছিল, সার্জেনরা বছরে অন্ততঃ দুটো হলেও কেস পাচ্ছিল।" শিবুদা বললেন, "এবার থামবেন ভোলাদা? আমাকে কিছু বলতে দেবেন্?” "দুটো ব্যাপার আছে আমার মনে হয়। সরকার বলচেন, দেশে যে হারে আলুচাষী, গমচাষীরা আত্মহত্যা করছে তার অন্যতম কারণ হল গম, আলু এসব বিক্রি পড়ে যাওয়া। মানুষ ডাল খায়না আর। ডালের দাম বেশি তাই। ভাত-রুটি-ডাল খাওয়া কমে যাচ্ছে তাই সরকারের হঠাত মনে হয়েচে ম্যাগি হল যত নষ্টের গোড়া। মানুষ ম্যাগি বেশি খাচ্ছে তাই ম্যাগির ব্যবসা লাটে ওঠাও। আর সরকারী কোঁদল চাপা দিতে কি ওষুধ লাগে জানেন তো ভোলাদা? শুধু ঠিক জায়গাটায় ঐ কোম্পানী তার দেয় অঙ্কটা মিটিয়ে দিন, এই আমার ঐকান্তিক ইচ্ছা।" কলেজের এক প্রোফেসরের নামটাই দিয়ে দিলাম "ম্যাগি" কারণ ওনার মুদ্রা দোষ। ওনার বোরিং লেকচারে ব্যতিবস্ত হয়ে আমরা "আর কতক্ষণ" ম্যাম জিগেস করলেই উনি শুধাতেন "টু মিনিটস" ! আমরা ওনার নাম বদলে দিয়ে রাখলাম "ম্যাগি" সেই ব্র্যান্ড আজ বিপর্যস্ত। সেই সুখ আজ অসুখে পরিণত। সেই হলুদ প্যাকেট আজ বিতাড়িত। সলমন খান অত বড় দোষ করে পার পেয়ে গেল আর ম্যাগির নামে যত্ত দোষ! আরে মশাই জ্বরে গা পুড়ে যাওয়া বাচ্চার ম্যাগি খেয়ে অসুখ বেড়ে গেছে বলে তো শুনিনি কখনো। একশো গ্রাম ম্যাগি আধখানা পেঁযাজ আর একটা ডিম দিয়ে দিব্যি কমপ্লিট মিল! আর কুকিং টাইম দুমিনিট। নো হ্যাপা অফ গেটিং গ্যাস আর পেটও ভরবে জেনো, ব্যাস! অতএব বস্তিতেও স্বস্তি। হাইরাইজেও মস্তি। ম্যাগি হল ফুড দুনিয়ায় সেলিব্রিটি। আজ ম্যাগির মধ্যে এমএসজি তাই এত হুজ্জুতি তোমরা করো! তোমরা যে সব বুড়ো খোকা আর কারো দোষ দেখতে নারো! কত লোক কথা দিয়ে কথা রাখেনি তার বেলা? কত ব্ল্যাক মানির হদিশ পাওনা তার বেলা? কত করাপশান "দেবা: ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা:”, তার বেলা? কত মামলা সুবিচার পায়না তার বেলা? কত টুপি প্রতিনিয়তঃ আমাদের পরতে হয়, অন্যতম সমাজবন্ধু ডাক্তারবাবুর দ্বারা। তার বেলা? অতএব বন্ধু গুজবে কান দিবেননা। দিন আগত ঐ ! ম্যাগি বেঁচে থাকিবে। তার জনক মিষ্টার নেসলে অত বোকা নন। তিনি জানেন এ দেশে কিভাবে ব্যাওসা পাতি করতে হয়। টু আর ইজ হিউম্যান। একটু সময় দিন কেবল। তাঁর অপত্যকে রক্ষা তিনি‌ই করিবেন, বলাই বাহুল্য।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ১৪ই আগস্ট ২০১৬ 

Monday, August 8, 2016

একুশে যোগ

"বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো" ... রবিঠাকুরের কথা। আর সেইস্থানেই তিনি খুঁজিয়া পাইলেন স্বামীজিকেও। স্বামীজি বলিয়াছিলেন জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ এবং রাজযোগের কথা। এবার উত্তিষ্ঠিত, জাগ্রত ভারতবাসী তথা সারা বিশ্বের মানুষ দেখিল চিরন্তন, শাশ্বত ভারতের ব্যায়াম যোগ। শেষমেশ রবিঠাকুর,বিবেকানন্দের আদর্শ মাথায় ল‌ইয়া স্বাস্থ্য‌ই জীবনের মূলমন্ত্র হইল। প্রথমে শৌচাগার তাহারপর ব্যায়ামাগার। অতএব প্রথমে বিয়োগচিন্তা তারপর যোগচিন্তা। না, না যোগের অর্থ জলযোগ নয় কোনোমতেই। প্রথমে স্বাস্থ্য তৈরী করা, তাহার পর "স্বাস্থ‌ই সম্পদ" এই আপ্তবাক্য মাথায় রাখিয়া "লাগো কাজে, কোমর বেঁধে, খুলে দ্যাখো জ্ঞানের চোখ, কোদাল হাতে খাটে যারা, তারাই আসল, ভদ্রলোক" । "ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে" কি না তাহা হইল মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন তবে যোগাভ্যাসের এক্সোথার্মিক বা তাপনিঃসারক বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপশক্তি নির্গত হ‌ইবে । যোগাভ্যাসকে একটি তাপনিঃসারক বা এক্সোথার্মিক প্রসেস বলা যাইতেই পারে। ফলস্বরূপ প্রচুর স্নেহ ঝরিবে আকাশে, বাতাসে। চর্বি গলিবে, ঘামের দুর্গন্ধে টেঁকা দায় হইবে। সকল স্নেহ, শ্বেতসার যাইবে ব্যায়ামাগারের নয়ানজুলিতে। উহাকে সাফ করিতে রাজ্যে রাজ্যে কর্মসংস্থান হইবে । নয়ত অচিরেই দেশ আরো গরম হইয়া উঠিবে। কারণ স্নেহ অতি বিষম বস্তু। তাপ নিঃসারক। একেই বিশ্ব উষ্ণায়ণ তায় আবার মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হ‌ইতে ব্যায়ামের দরুণ যে ক্যালরি দহন হইবে তাহা কোথায় যাইবে? দেশের অভ্যন্তরেই ঘুরপাক খাইবে। শুধু দেশ নয় রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্তর্গত দেশগুলিতেও তাপ উদ্বৃত্ত হ‌ইবে। সবকিছু চিন্তা করিয়া রাষ্ট্রপুঞ্জ বিবেচনা করিয়াছেন, পৃথিবী নামক গ্রহটির অভ্যন্তরে একটি সেন্ট্রালি কনট্রোলড এয়ার কন্ডিশানার বসাইবেন। পৃথিবীর মনুষ্যকুল যোগের সাথে ভোগ করিয়াও বাঁচিবে আর যোগাভ্যাস করিয়া বেঁচেবর্তে দিব্যদৃষ্টি লাভ করিয়া পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করিবে। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি বৃদ্ধি পাইবে। আমরা আরো "ভালো" করিয়া জীবনযাপন করিব। কলিযুগে মানুষ অভ্যাস করিবে কলিযোগ। সমাজের সর্বস্তরে মানুষ অনুভব করিবে নতুন যোগ। কি জানি কাহার যোগসাজসে যোগাচার্যের এরূপ যোগপ্রীতির বাণী মনুষ্যকুলে সঞ্চারিত হ‌ইল! তবে যোগাচার্যের ব্যায়ামাগারের যোগ-ঊর্মি আমাদের উভয়বঙ্গকেও ভাসাইয়া দিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। আমি বাপু আদার ব্যাপারী। যোগ-বিয়োগের সাথে আমার পরিচয় হ‌ইয়াছিল পাটিগণিতে। ইহা ব্যাতীত এযাবতকাল বহু যোগের সাথে যোগাযোগ হ‌ইয়াছে আমার। যোগদিবস উদ্‌যাপনে আমার ইহার পূর্বে কোনো মাথাব্যথা ছিলনা। কিন্তু যত‌ই বয়স বাড়িতে লাগিল তত‌ই বুঝিলাম যোগ না করিলে জীবনের সবটুকু‌ই বিয়োগফল। অতএব এ ব্যাপারে কারোর বিরুদ্ধে কোনো অনুযোগ বা অভিযোগও না করিয়াই সামিল হ‌ইলাম সমগ্র বিশ্ব সহ আমার দেশ, তোমার দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার সহিত । যোগ না করিলে জীবন হ‌ইতে পিত্জা-বার্গার-মকটেলাদি, রোল-চাউমিন-ফুচকা-মিষ্টান্নাদি জীবন হ‌ইতে বিয়োগ দিতে হ‌ইবে। অতএব "এখন আর দেরী নয়, ধরগো তোরা, হাতে হাতে ধরগো, এবার যোগাসনে বসতে হবে, ন‌ইলে বিপদ হয়গো" যোগবলে তুমি যোগাচার্য আমি যোগমায়া। চলো, করেঙ্গে অ‌উর মরেঙ্গে। ডু অর ডাই। ভারতকে বিশ্বের দরবারে যোগ করিব আমরা। বিয়োগ করিব দ্বেষ, হিংসা। যোগবলে ছড়াইব শান্তির বাণী। অহিংসার বার্তা। হ্রাস পাইবে তোমার-আমার-সকলের মধ্যপ্রদেশ। বৃদ্ধি পাইবে হৃদয়ের উত্তরপ্রদেশ। আর যাহারা অংশ ল‌ইলনা তাহারা অচিরেই অধঃক্ষিপ্ত হ‌ইবে । "সবার পানে যথায় বাহু পসারো, সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমারো ..." অতএব বাহু পসারিয়া, চক্ষু উন্মিলীত করিয়া বিশ্ববাসীর সহিত গত একুশে জুন আমরাও যুক্ত হ‌ইলাম। প্রেম বিলাইলাম। প্রেম জাগাইলাম। এক্ষণে বিশ্ব যোগদিবসের এই যোগকে আমরা কি যোগ বলিয়া আখ্যা দিব? আমার মতে ইহা স্বামীজির আরেক প্রকার কর্মযোগেরই অন্তর্ভুক্ত যাহাকে "প্রেম যোগ" বলিয়া অভিহিত করা যাইতেই পারে। কিন্তু উহাতে যুবসমাজ চিত্তবৈকল্যের হেতু ক্ষতিগ্রস্ত হ‌ইয়া পড়িতে পারে। যোগ হ‌ইল একপ্রকার সাধনা, আরাধনা, উপাসনা বা তপস্যার ন্যায় একাগ্রচিত্তের ফসল। সেখানে "প্রেম, ভালোবাসা" নৈব নৈব চ। অবশেষে রাজশেখর বসুর উদ্ভাবিত বিল্বকাষ্ঠের ল্যাঙট বৃত্তান্ত জানিতে পারিয়া বিশ্ব যোগ পরিষদ এবং জয় হনুমান একাডেমী সমগ্র বিশ্বের পুরুষগণের জন্য মাথাপিছু একটি করিয়া ঐ কৃচ্ছসাধনার ল্যাঙট অর্ডার দিয়াছেন। এবং অচিরেই কোনো এক পৃষ্ঠপোষক সেই টেন্ডারে সাড়া দিয়া ল্যাঙটের অর্ডার পাইয়াছেন বলিয়া জানিলাম । এবার প্রশ্ন হ‌ইল বিশ্বের যোগীরা ডাকযোগে সুদৃশ্য প্যাকেট সহযোগে ল্যাঙট পাইবে। ল্যাঙট পরিয়া যোগীর শরীরে ব্যথাবিষ বৃদ্ধি পাইবে। দেশবাসীর মনোযোগ সহকারে এহেন যোগাভ্যাসের দাপটে চিকিত্সকদের কিঞ্চিত ভয় হ‌ইতেছিল বটে। রোগীরা ঔষধ-যুক্ত না হ‌ইয়া মুষ্টি যোগ, হঠযোগ করিতেছিল। তাহাতে উহাদের ব্যাওসাপাতি লাটে উঠিতেছিল। বর্তমানে ল্যাঙটকান্ডে উহারা আবারো ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিবেন, সেটুকু স্বস্তির নিঃশ্বাস। এবার যোগিনী বা যোগমায়ারা কি পরিবেন? বিশ্ব যোগ পরিষদ বলিল, "কেন? উহারা বল্কল পরিবে, কাঁচুলি পরিবে। মাথার কেশরাজিকে পরিপাটি করিয়া শিরের সু-উচ্চে কবরী বাঁধিবে। ঠিক যেমন আদি-অনাদি ভারতবর্ষের আশ্রমকন্যারা করিতেন" জয় হনুমান দল বলিল " উহাতে যোগভ্রষ্ট হ‌ইবে পুরুষগণ। মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটিবে। যোগের বদলে বিয়োগ হ‌ইবে।" অগত্যা বিশ্ব যোগ পরিষদ ধার্য করিল নতুন উপায়। ঘোড়দৌড়ের মাঠে ঘোড়াদের চিত্তচাঞ্চল্য রুখিবার জন্য চোখের যেরূপ ঢাকনা ব্যবহৃত হয় তেমনটি ধারণ করিয়া পুরুষেরা যোগাভ্যাস করিবে। সেযাত্রায় যোগাভ্যাসে কোনো চিত্তচাঞ্চল্যের আভাসমাত্র পাওয়া যাইবেনা এই তাহাদের বিশ্বাস।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ  ৩১শে জুলাই-২০১৬  

Monday, July 18, 2016

হেডাপিসের বড়বাবু

সোমবার এলেই মুখটা ব্যাজার হয়ে যায় বড়বাবুর । আবার আপিস শুরু । আপিস মানে রোজ সকলকে বেজার মুখে যেখানে যেতে হয় ! যদি সরকারী আপিস হয় আর যদি বাঙালী সেখানকার বড়বাবু হন তাহলে একটু আধটু দেরী করলে বড় একটা ক্ষতি নেই । তিনি বেলা দশটা পার করে এলেই হবে । তাঁর ক্ষেত্রে সময়ের বিশেষ ছাড় । তিনি আপিসের পাপসে দশটা বেজে দশ মিনিটে পা দেবেন তো দশটা বাজতে দশে নয়। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মাথা পুঁছবেন । পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমার কাঁচ পুঁছে চিরুনিমাসীকে হাতে ধরে আয়নার সামনে যাবেন । আম-বাঙালীর মত বড়বাবুরও ভিশন খুব একটা প্রবল নয় তাই সকলের মত বড়বাবুর চশমা চোখে । এপাশের চুল ওপাশে রাখবেন খুব ধীরে সুস্থে । তারপর আফ্রিকার মানচিত্রের মত চকচকে টাকটিকে দেখে নেবেন চট করে । এবার মুখটা কুলকুচি বেসিনে । গিন্নীর দেওয়া আদরের পানের কুচোটুচো গুছিয়ে ফেলে দিয়ে টেবিলের দিকে । তখন ঘড়ির কাঁটা পৌনে এগারোটা ছুঁই ছুঁই । টেবিলে বসেই মাথা গরম । বিস্তর ফাইলের স্তূপ । ধূলোটাও ব্যাটারা ঝেড়ে দেয়না আজকাল । এবার মুঠোফোনের টুংটাং । শালী, আধা ঘরওয়ালির দুষ্টুমিষ্টি ফচকেমি.. দু-চার মিনিট । ততক্ষণে আপিসের বাইরে মামণি টি-ষ্টলের মামণি এসে চায়ের গেলাসে ঠকাস করে চা রেখে চলে গিয়েছে টেবিলে । কিছুটা চেঁচানো" বিস্কুট কৈ রে মামণি?" এই কত্তে কত্তে সাড়ে এগারোটা । এবার ফাইলের স্তূপ থেকে সীতা উদ্ধারের মত করে টেনে হিঁচড়ে একখান চোতা কাগজ বের করে তাতে নিজের নামটা স‌ই করা হল । সেই মহাযজ্ঞে আরো একটি ঘন্টা কাবার । এবার মামণির মা এসে বলে " স্যার, আজ কি খাবেন?রুটি-ডিমের কারি, পরোটা-আলুর দম না এগ-চাউচাউ?" মামণির মায়ের ঝটিতি আগমন ও প্রস্থানে কিছুটা শান্তি ও আপিসে আসার তৃপ্তি । বেঁড়ে খাবার বানায় বৌটা । বাড়িতে তো "এটা খেওনা, ওটা খেওনা".. কত্ত শুল্ক চাপানো! আর আপিসে নো কোলেস্টেরলের কচকচানি ! মামণির মায়ের হাতের গুণে সব অসুখ উধাও । শুধু সুখ আর সুখ ! ঠিক একটা বাজতে না বাজতেই মামণির মায়ের হাতে ধোঁয়া ওঠা নিত্য নতুন ডিশ! বাড়িতে তো গিন্নীর সিরিয়ালের দাপটে রান্নার মেয়েছেলেটা সাত সকালে হুড়মুড় করে রুটিটাও ক্যাসারোলে ভরে রেখে চলে যায় । আহা! মামণির মায়ের হাতের ফুলকো ফুলকো রুটিটাও কি দারুণ লাগে তখন খিদের মুখে । এবার মুখটুক পুঁচে টুচে মগজের গোড়ায় আনফিল্টার্ড ধোঁয়া দিতে একটু পাপসের বাইরে পা । একটু আড্ডা, আধটু ধোঁয়া ছাড়া । রাজনীতির কূটকচালি থেকে শেয়ারমার্কেট । চেয়ারের গদিতে ফিরে আসতে আসতে তিনটে । আবার চায়ে চুমুক, সাথে মামণির হাসিমুখ । বুদ্ধি খুলে গেলে একটু কারোর পেছনে কাঠি করা নয়ত টেবিলে মাথা রেখে ছোট্ট ন্যাপ । হার্ট ভালো থাকে এতে । বয়স তো আর কম হলনা বড়বাবুর ! চারটে বাজলেই ব্যাস্! এবারে আর কে পায়! পাপসের বাইরে পা । পাঁচটায় মেট্রোতে পা দিতে পারলে শান্তি । আর ছটায় বাড়ি ফিরেই আবার চা । এবার কালো-চা। এক টুসকি বীটনুন আর দু ফোঁটা লেবুর রস দেওয়া কেফিন। এন্টি অক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাবোনয়েড সব আছে এই চায়ের মধ্যে । গিন্নীর বচন, খনার চেয়েও দামী । সারাদিন ধরে কাগজ আর টিভি সার্ফ করে সঞ্চিত জ্ঞানকণা ! হার্ড লাইফ বলে একে! এই কত্তে কত্তে আরো চারটে বছর পার করে দিতে পারলে ব্যাস! রিটায়ারমেন্টের পর বাড়ি বসে বসে পা নাচানো আর মাস গেলে পেনশন । সমস্যা একটাই, কারণে অকারণে গৃহযুদ্ধ । মঙ্গলবারে বড়বাবুর ফাইলের জঙ্গল সাফ করার কথা। কিন্তু সাফ করব বললেই কি আর করা যায়? সেদিন আবার মামণির চায়ের দোকানে আলু পরোটা মেলে। অফিসে গিয়েই মন উশখুশ করে কখন আলুপরোটা নিয়ে হাজির হবে মামণিসোনা। বাড়িতে সুগারের প্রকোপে আলু নৈব নৈব চ! বুধবারে বাবু কোনো ভালো কাজে হাত দেননা। কেউ কিছু স‌ইসাবুদ করাতে এলে বলেন "রেখে যাও ভাই, আজ হবেনা!" আমার জন্মলগ্নেই নবমপতি বুধ অষ্টমে বিরাজ করছে। তাই জ্যোতিষি বলেই দিয়েছিলেন বুধবারে কোনো কাজে হাত না দিতে! বিষ্যুদবার গুরুবার। বাড়ি ফেরার পথে উপোসী গিন্নীর জন্যে দৈ-মিষ্টি নিয়ে ফিরতে হয়। সকালে আপিসে এসেই সেই কথাটা বারেবারে মনের কোণে উঁকি দেয়। গিন্নী একা একা সাবাড় করে সেনমশায়ের লাল দৈ আর দেলখুশ! আর বাবু সুগারের করাল চাউনিতে চেয়ে চেয়ে তা দেখেই যান। সেই মন খারাপের জেরে সকাল থেকে কোনো কাজেই মন লাগেনা যেন। শুক্কুরবার মানেই উইকএন্ডের শুরু। আমেরিকার লোকজন কোথায় তখন ফ্রাইডে পার্টির আলোচনা করে! বাবুর আপিসে সেসবের বালাই নেই! পার্টি হলে একটু জমিয়ে নিষিদ্ধ পানীয়, মুরগী মটন পেটে পড়ার স্কোপ থাকে। সেই নিয়ে ভাবতে ভাবতে টেবিলে বসে বসে লম্বা হাই তোলেন তিনি! কে যে বলে! এই দেশেতেই জন্ম যেন, এই দেশেতেই মরি! কক্ষণো নয়! মরিব মরিব সখী নিশ্চয় মরিব । কিন্তু এদেশে আর জন্মাব না। আর শনিবারের হাফবেলাটা কোনো রকমে পার করেই বাড়ি গিয়ে মটন স্টু দিয়ে ভাত খেয়েই দিবানিদ্রা যান বাবু। অতএব আপিসে গিয়ে নতুন কোনো কাজে হাত লাগানোর কোনো কোশ্চেন নেই। কেউ কোনো মিটিং ডাকলে বাবু বলেন, বারবেলায় মিটিং নাস্তি। এভাবেই কাটে হেড আপিসের বড় বাবুর সাপ্তাহিক আপিস ভ্রমণ । তিস্তার জল বয়েই চলে আপন খেয়ালে। নেপালের মাটি চিড় খায়। সলমনের মামলায় রায় হয়। হৃত্বিকের ডিভোর্স হয়। সানিয়াকে টপকে যায় সাইনা। আইপিএলে কেকেআর ইডেন কাঁপায়। বাবুর পত্নী মদনগোপালের পুজো করে চলেন মমতাভরে। বাবুর টেবিলের ফাইল লালকুঠি থেকে নবান্নের নীলকুঠিতে যায় কয়েক ক্রোশ পথ ঠেলে। বাবুর বদল হয়না। সোম থেকে শনি এক‌ইরকম কাটে। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি। কখনো রিসেশন, কখনো ইনফ্লেশন। কখনো পরিবর্তন কখনো প্রত্যাবর্তন । কখনো লাল কখনোবা নীল ফিতের ফাইলে বিশেষ চিঠি আসে বাবুর টেবিলে। বাবু প্রমোশন পান এভাবেই ।
উত্তরবঙ্গ সংবাদ ৭ ই আগষ্ট ২০১৬

Thursday, July 14, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (১২) --- উল্টোরথে সোজাকথা


"মার আবার উল্টো আর সোজা, রথ এলেই আমার কাজ বাড়ে"   ঐ আবার বিমলি পিসির বিলাপ শুরু হল।
মন্দিরের ভেতর লক্ষ্মীমাসীর এই কটাদিন বেশ ঢিলেঢালা ছিল কাজেকম্মে। দেখতে দেখতে এগিয়ে এল সেই দিন! মন্দিরের বাইরে এসে চেঁচিয়ে বলল লক্ষ্মীমাসী,
"দিদি গো, হয়ে গেল আমাদের গল্প করা। এবার কাজ করতে করতে পরাণ বেরিয়ে যাবে গো দিদি"  
বিমলিপিসি বলল, "কেন তোর তো খুব ভাল লাগে ওনার সেবাটেবা করতে। ঐ নিয়েই পড়ে থাক সারাটা জীবন" 
"দিদি অমন বোলোনা। উনি বহুরূপী। আজ পুণর্যাত্রা। মাসীর বাড়ি গেছেন সবেমাত্র আটদিন। যেতে না যেতেই মন উচাটন দিদি। তোমার হয়না এমন?"   
"হলেই বা কি ! উনি কি আর আমার জন্যে ভাবেন? ওনার তুমি হলে কিনা খাস সুয়োরাণী। তারপর আছেন সেই মাসী আর বোন। তাদের জন্যে ভাবতে ভাবতে আমার কথা ভাববার আর সময় ক‌ই? তা বাপু, মাসীর বাড়ি গেছ ফূর্তি করতে, আরো কটাদিন থাকলেই তো পারতে! বুঝিনা কি আর? যদি পুরীর মন্দিরের সব ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায়। অত কাঠখড় পুড়িয়ে যাওয়া আর আসাই সার! কথায় বলে না?  আসতে পাগল, যেতে ছাগল" 
"দিদি অমন বোলোনা। উনি সবজান্তা"
"কেন বাপু? মাসীর জন্যে দরদ উথলে উঠছিল তা আবার সেই দরদ বাষ্প হয়ে উবে গেল" 

আজ সকাল থেকেই বিমলিপিসি শুনতে পাচ্ছেন  কানাঘুষো। 

খোলকত্তাল নিয়ে সব জগন্নাথ, জগন্নাথ করতে করতে ভাবে বিভোর হয়ে পুরবাসীরা পথে নেমেছেন । তিন মক্কেলে মাসীর বাড়ি থেকে এই রওনা দিল বলে।
"মাসীর বাড়িতে এই কটাদিন খাওয়াদাওয়ায় খুব অনিয়ম হয়েছে...কাজের মেয়েটা উঠোন ধুতে ধুতে বলছিল। কে জানে, বদহজম, গ্যাস, অম্বল হল কিনা! কত করে বল্লুম, ডাইজিনের পাতাটা, জেলুসিলের বোতলটা সঙ্গে রাখ। তা ওনার দাদা বল্লেন, তুমি অত চিন্তা কোরোনা বৌদি। আমাদের কিছু হবেনা। জামার পকেট নেই। কোথায় নেব ওষুধপালা। আমি বল্লুম, এই মহাস্নানের পর জ্বরজারি থেকে উঠলে সকলে। তা আমার কথা শুনবে কেন?"
"যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়ার লোকের ঘুম নেই ! কাজের মেয়ে অষ্টমীটা বলছিল,
"সকাল থেকে গুন্ডিচায় সাজো সাজো রব। তা বলি মাসীর বুঝি বোনপো, বোনঝিদের বিদেয় দিতে কষ্ট হবেনি?' 
" এত রমরম করে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে ক্যান রে অষ্টমী?"   তা অষ্টমী বলল,
" মা, রথের ঝাড়াপোঁছা, সাজসজ্জা নিয়ে মত্ত লোকজন। হরিনামে মাতোয়ারা তারা। চন্দনবাটা, অগরুর সুরভিতে ম ম করছে পথঘাট"  
বিমলিপিসি বলল,
"তুই থামবি অষ্টমী? কাজগুলো শেষ কর আগে।ওরা এসে পড়ল বলে!  বলি এত‌ই যদি মাসীর আহ্লাদেপনা তা আর কটাদিন থাকতে পারলনা তারা? শরীরটা বিগড়ে গেলে তখন আর মাসী কোথায় ? তখন এই বিমলির কথা মনে পড়ে। আবার যত্ন-আত্যি করব, পথ্যি করে সারিয়ে তুলব তারপরে আর চিনতে  পারবেনা আমাকে।"   

অষ্টমী বললে,
"জানো মা? সেখানে পুজোর সব বাসনকোসন ঝকঝক করছে। তেনাদের রাজবেশ বিরাট ট্রাঙ্কে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে লোকজন। কেউ নারকোল কুরছে, কেউ ম্যাওয়া কুচোচ্ছে। দুধ ফুটে ঘন হয়ে ক্ষীর হচ্ছে। বড় বড় মাটির মালসায়  কলাপাতায় ভোগরাগ প্রস্তুত হচ্ছে গো । রথের মধ্যে ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে সাফ করছে"  
বিমলা কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, আচমকা লক্ষ্মীমাসী এসে বল্লেন,
"দিদি, শূন্য এ মন্দির বেদীটা আর দেখতে ভাল লাগেনা গো। অপেক্ষায় আছি আমি। শুতে বসতে পারছিনা একমূহুর্ত। কেবল মনে হচ্ছে ঐ বুঝি রথ এল! কেন এমন হয় গো দিদি? এর নামই বুঝি বিরহ?'     
"আদিখ্যেতা করিসনি ছোটো। পাড়ার লোকেদের আদেখলাপনা আর ভাল্লগেনা আমার। পুষ্পবৃষ্টি করবে, কেওড়া, আতর, অগরু,কর্পূরের জল ফোয়ারার মত ছেটাবে তাঁর সব্বো অঙ্গে। নাচ-গান-ওডিশী নৃত্যের মধ্যে দিয়ে তাঁকে বিদায় দেবে, সারাক্ষণ  হাতপাখা দিয়ে বাতাস করবে, দোলায় করে দোলা দেবে, চামর দোলাবে, মাথার ওপর ছাতা ধরবে আর আমি বাপু জীবনে একটু যত্ন পেলুমনি! বেশ আছ বাপু তোমরা তিনটিতে মিলে। খাচ্চদাচ্ছ, লাইভ নাচাগানার প্রোগ্রাম দেখছ, এই বেশ হাওয়া বদল হল তোমাদের। আমার কথাটা ভেবেছ একবার? নিজেদের বেলায় আঁটিশুটি, আমার বেলায় দাঁতকপাটি। কেন একবার আমাকে নিয়ে যেতে নেই বুঝি মাসীর বাড়ি? সারাবছর মাসীটা খবর নেয়না, ঝিঙের বাড়িও মারেনা আর এঁরা ঐ মাসীর বাড়ি যায় ফূর্তি মারতে।'

লক্ষ্মীমাসী বলে উঠল, "এবার এলেই লিপিড প্রোফাইলটা চেক করাতে হবে দিদি। যে হারে মাখন, ননী খাচ্ছে এঁরা।" 
 বিমলিপিসি বলল, "যাবার আগে বলেছিলুম প‌ইপ‌ই করে। শুনলনা। এবার আসছে দুলকিচালে নাচতে নাচতে, আর আমার মাথাটা খেতে' 

- ঐ বুঝি রথ এসে গেল, দ্যাখ তো অষ্টমী।
বিমলিপিসির এই বয়েসেও মিনসেটার জন্য বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে উঠছে। 
- কেন এমন হচ্ছে রে লক্ষ্মী? তোরও হচ্ছে নাকি? তারা গ্যাছে মাত্র আটদিন হল, আর মনে হচ্ছে আট বছর।
- দেখেছ তো দিদি, কেন ওরা মাসীর বাড়িতে অতদিন থাকেনা? এই তোমার জন্য, বুঝেছ? তোমাকে ছেড়ে উনি এক মূহুর্ত থাকতে পারেন না।
বিমলিপিসি মুচকি হেসে, ব্লাশ করতে করতে বলল,
- তাই?  তুই যেন সবজান্তা। 

Tuesday, May 3, 2016

স্বর্গীয় রমণীয় (১১)


কলের মধ্যে মোহর ভাগ বাঁটোয়ারার পর দেবর্ষি নারদ প্রস্থান করলেন । তারপর বহুদিন কেটে গেল। কেউ নারদের কুশল কামনা করেনা, খোঁজখবর নেয়না, ইমেইলে বার্তা বিনিময় করেনা দেখে তিনি হুল ফোটাতে উদ্যত হলেন। আকাশতলে, অনিলে, জলে ডিজিটালি কপি-পেষ্ট হল সেই বার্তা....হুলায়ন, হুলায়ন! সংসারে সকলে একযোগে বলে উঠল, নারদ, নারদ! ঐ বুঝি এল ঝড়। উল্টানো জুতোর পাটি সোজা করে মর্ত্যবাসী বলে উঠল, নারায়ণ, নারায়ণ! প্রত্যাদেশ হলে দেবর্ষি যেন এ পথ দিয়ে না যান।

গৃহবধূরা হেসে খলখল করে গড়িয়ে পড়ল... অত মোহর দিয়ে যদি শহরটা লন্ডন হত! আহা! ভোল পাল্টে যেত! কেউ বলল, না বাপু, লন্ডন হলে দেখো খুব পবলেম হবে! তাই তো আমি কলকাতাকে লন্ডন হতে দেবনা, কক্ষণো না! গঙ্গা আমার মা থাক্! তার আর টেমস হয়ে কাজ নেই।

কেউ বলল, আমাদের স্কুলজীবনে গরমকালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল লোডশেডিং। তখন ইনভার্টার ছিলনা রোজ নির্দ্দিষ্ট সময়েই পাওয়ার কাটের পূর্বাভাস পেয়ে যেতাম আমরা। তখন আমাদের দখিণের খোলা বারান্দাই ভরসা। সেখানেই জ্যামিতি, পরিমিতি আর উপপাদ্যে নিয়ে জোর কসরত চলত আমাদের। সকাল থেকেই হ্যারিকেনে কেরোসিন ভরে, ঝেড়ে পুঁছে রেখে, তার সলতে ঠিকমত কেটে সমান করে দেওয়া হত ।তখনো গঙ্গার পাড় জুড়ে ছোটবড় মাঝারি কারখানায় বড় বড় তালা ঝোলেনি। এখন কলকাতা শিল্পহীন, বিদ্যুতের চাহিদাও নেই। কলকারখানাও নেই বড় একটা তাই লোডশেডিং মুক্ত দিন। ভাগ্যি শিল্প নেই নয়ত এইগরমে লোডশেডিং! ভাবতো বন্ধুরা! চুলোয় যাক্‌ শিল্প।

রাস্তার ধারে সারেসারে, থোকাথোকা আলো জ্বলে।
আলোর ঝলকে ঘুম আসেনা, তাই তো জেগে র‌ই !

এই দ্যাখো না রাত জেগে জেগে কেমন কবি হয়ে গেনু!

তাই দেখে আরেকজন সহচরী বলে উঠল, এই দ্যাখ, দ্যাখ, ফেসবুকে কেমন কবিতা লিখেছি!

এই আমরা বেশ আছি, খাচ্চিদাচ্চি, কলকলাচ্ছি।
ফ্যানের তলায়, এসির ঘরে, ফ্রিজের জলে, শরবত গিলে,
ঘন্টাখানেক সঙ্গে খবর , যুক্তিতক্কে কাটছে বছর ।
রেখেছো বাঙালী করে উন্নয়ন তো দেখোনি।
মাছেভাতে দুপুরঘুমে মানুষ তো আর হওনি।
শিল্পীপুজোয় বেজায় দড়ো, শিল্প কি তা বুঝবে বড়ো?
কেব্‌ল চ্যানেল হাজার হাজার, সোশ্যালনেটের গরম বাজার।
তার ওপরে পাওয়ারকাটম্‌? কক্ষণো নয় দারুণ গরম।

আরেকজন বলে উঠল, যাই আবার দেখি গিয়ে আমার পরিচিত কেউ নারদের হুলবিদ্ধ হলেন কিনা! মলম দিতে হবে। বড় জ্বালা হুলের বিষে। ছোটবেলার বিজ্ঞানে পড়েছিলাম ফার্ষ্ট এইডের কথা। ঠান্ডাজল, ক্যালামিনল, খাবার সোডা, এন্টিএলার্জিক। তাতেও না কমলে চালাও পানসি মোক্ষম দাওয়াই কর্টিকোষ্টেরয়েড লাগিয়ে দাও ভাই!